সোমবার, ০৩-আগস্ট ২০২০, ০৩:৪৭ অপরাহ্ন
  • খেলা
  • »
  • ফুটবলের প্রথম রাজপুত্র মিশেল ক্রিকেটের ইডিপাস আসিফ 

ফুটবলের প্রথম রাজপুত্র মিশেল ক্রিকেটের ইডিপাস আসিফ 

shershanews24.com

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১১:৩২ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ২৬ আগস্ট, ২০১০। লর্ডসের আকাশ অন্য দশ দিনের মতোই ঝকঝকে ছিল। একটু পর শুরু হবে ইংল্যান্ড ও পাকিস্তান চার ম্যাচ টেস্ট সিরিজের শেষটি। এ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে। সিরিজ বাঁচাতে পাকিস্তানের ‘মাস্ট উইন’ গেইম। ক্যাপ্টেন সালমান বাট টস জিতে ফিল্ডিং নিলেন। তাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন দেখাল - কিছুক্ষণ পরই একটা মিথ্যে অভিনয় শুরু করতে হবে যে!  প্রথম ইনিংসের তৃতীয় ওভারের প্রথম বল। মোহাম্মদ আমিরের ওভারস্টেপ করা বলটিকে ‘নো’ কল করলেন আম্পায়ার বিলি বাউডেন। একই ক- দশম ওভারের শেষ বলে, তবে এবার বোলার ভিন্ন, মোহাম্মদ আসিফ। হ্যাঁ, সেই আসিফ, যার নাম শুনতেই স্মৃতির মানসপটে ভেসে ওঠে একজন ফিক্সারের মুখ, যিনি ‘জেন্টলম্যানস গেইম’কে কলুষিত করেছিলেন। ‘ক্রিকেটের মক্কা’-খ্যাত লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড সাক্ষী হয়েছিল ক্রিকেট ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়টির সাথে।
আমরা আজ কথা বলব ফিক্সিংয়ের অপরাধে ৭ বছর (পরে যদিও আংশিকভাবে শিথিল করা হয়েছে) নির্বাসনে থাকা পাকিস্তানি ফাস্ট বোলার মোহাম্মদ আসিফকে নিয়ে। ওয়াসিম-ওয়াকার পরবর্তী যুগে যাকে ‘ফাইনেস্ট পেসার’ ধরা হয়েছিল। কিন্তু অন দ্য ফিল্ড - অফ দ্য ফিল্ডে একের পর এক বিতর্ক যাকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে।  
ক্যারিয়ারের শুরু যেভাবে
মোহাম্মাদ আসিফ। মোহাম্মদ আসিফের জন্ম ১৯৮২ সালের ২০ ডিসেম্বর, পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে। প্রায় ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি লম্বা। একটি ক্রিকেটপাগল জাতি হিসেবে মোহাম্মদ আসিফের রক্তেই মিশে ছিল ক্রিকেট। প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন খান রিসার্চ ল্যাব, ন্যাশনাল ব্যাংক কোয়েটার, শিখুপুরা, শিয়ালকোট এবং লিসেস্টারসেয়ার দলের হয়ে খেলে থাকেন। তিনি ২০০৫ সালের জানুয়ারীতে পাকিস্তান ক্রিকেট দল হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট ক্রিকেটে আগমন করেন। সেখানে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় দলের টিকেট পেয়ে যান। বাকিটা পথ ছিল সাফল্য এবং বিতর্কে মোড়ানো। নিন্দুকের নিন্দা পারফর্ম করে আটকে দিয়েছেন ঠিক, কিন্তু এটিই শেষ অব্দি কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানি - একজন জাত পেস বোলারের অন্যতম পরিচায়ক হলেও সিম পজিশন এবং স্পিড যেন সায় দিচ্ছিল না। ১৩০-এর আশেপাশে বোলিং করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সার্ভাইভ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ছিল অনাস্থা। 
যা-ই হোক, আসিফের শুরুটা অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে টেস্ট ম্যাচ দিয়ে, সাল ২০০৫। তৎকালীন ‘সুপার পাওয়ার’ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ১৮ ওভার বল করে ৭২ রান দিয়ে থেকেছেন উইকেট শূন্য। এমন সাদামাটা পারফরম্যান্স দেশের বাইরে তার কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। অভিষেক ম্যাচের পর দ্বিতীয় ম্যাচটি খেলতে খেলতে লেগে যায় পুরো একটি বছর। ততদিনে আসিফ আরো পরিণত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন
সময়টা মার্চ, ২০০৬। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানের আরেকটি দ্বৈরথ। ফয়সালাবাদে ২য় টেস্টে দলে জায়গা পেয়ে সুবিধা করতে পারেননি আসিফ। ৩৪ ওভার বল করে ১০৩ রান দিয়ে পেয়েছেন একটি উইকেট। তৃতীয় টেস্ট, করাচি ন্যাশনাল স্টেডিয়াম। সিরিজ-নির্ধারনী শেষ ম্যাচ। ভারতের ব্যাটিং লাইনআপে শেবাগ-দ্রাবিড়-লক্ষ্মণ-শচীন-সৌরভদের কম্বিনেশন একটা নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে দলটিকে। প্রথম ইনিংসে ৭৮ রানে ৪ উইকেট পাওয়ার পর ২য় ইনিংসে ৪৮ রানে ৩ উইকেট নেন আসিফ। পাকিস্তান ম্যাচ জিতে নেয় ৩৪১ রানে, সেই সাথে সিরিজও। শেবাগ-লক্ষণ-শচীনদের ক্লিন বোল্ড করে দিয়ে স্পটলাইট নিজের দিকে টেনে আনেন ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান অব দ্য বল’। সে বছরটা আসিফের স্বপ্নের মতো কাটতে থাকে। এর পরের সিরিজেই শ্রীলংকায় ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করেন। এর পরের বছরের শুরুতে সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৩ ম্যাচ টেস্ট সিরিজে ১৯ উইকেট নিয়ে সিমিং কন্ডিশনে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। এছাড়া টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রথম উইকেট মেইডেনের কৃতিত্বও তার। 
বিতর্ক কথন
বিতর্ক এবং একজন আসিফ - একই বৃন্তে দু’টি ফুল যেন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ অবধি ছিলেন বিতর্কিত। এর সূত্রপাত ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে ‘২০০৬ সালের টেস্টের মধ্যে দিয়ে। উইকেট পেয়ে আবেগের বাঁধ হারানো উদযাপনের জন্য ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড কর্তৃক তিরস্কৃত হন, ফাইন দিয়ে এ যাত্রায় বেঁচে যান। মোহাম্মদ আসিফের প্রবল সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার যে কারণে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তা হচ্ছে ড্রাগ। যদিও নানা সময়ে মেডিসিন বা ভিটামিন বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, শেষমেশ ‘০৬ এর ১৬ অক্টোবর নিষিদ্ধ ড্রাগ ন্যান্ড্রোলন নেওয়ার কারণে তার আরেক সতীর্থ শোয়েব আখতারসহ তাকে ২ বছরের জন্য সাসপেন্ড করা হয় (যদিও তা পরে কমিয়ে আনা হয়)। ২০০৮ এর জুনে দুবাই এয়ারপোর্টে আবার গ্রেফতার হন একই অভিযোগে। ড্রাগের নেওয়ার অপরাধে আরো অনেকবার সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তির সম্মুখীন হন।   
এরপরের বিতর্কটা আরো গুরুতর। ‘২০০৭ এর ক্যারিবিয়ান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে গুঞ্জন ওঠে, সতীর্থ শোয়েব আখতারের সাথে বাকবিত-ার এক পর্যায়ে শোয়েব  আক্তার তাকে ব্যাট দিয়ে আঘাত করেন। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের তদন্তে শোয়েব আক্তার অভিযুক্ত হন এবং পাঁচ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন। পরে শোয়েবের সেবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা হয়নি। এ ঘটনার পর থেকে তাদের মধ্যে শীতল সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। এরপর আসে লর্ডস টেস্ট, সাল ২০১০। মোহাম্মদ আসিফের ক্যারিয়ার শেষ হয় সবচেয়ে বড় বিতর্ক দিয়ে। জুয়াডি মাজহার মাজিদের প্রি-প্ল্যানড ট্র্যাপে পা দিয়ে একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার শেষ করে দেন মোহাম্মদ  আসিফ। তৎকালীন অধিনায়ক সালমান বাট ও মোহাম্মদ আমিরের সাথে তাকেও নির্বাসনে পাঠায় ট্রাইব্যুনাল। ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আইসিসির অ্যান্টি-করাপশান ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন।
খসে পড়া এক ধ্রুবতারা
বিশ্ব ক্রিকেটে মোহাম্মদ আসিফের আবির্ভাব সাদামাটা হলেও শেষের আগ পর্যন্ত ছিল রঙিন। লর্ডসের টেস্ট চলাকালীন টেস্ট বোলিং র‌্যাঙ্কিংয়ে ডেল স্টেইনের পরই তিনি ছিলেন। লেজি লিথাল অ্যাকশন, উইকেটের দু’দিকে সুইং করানোর সক্ষমতা তাকে অনন্য করে তুলেছিল। বিশ্বের বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করতে ওস্তাদ মানুষটি হেরে গেছেন এথিকসের কাছে। এ যেন মিটিমিটি করে জ্বলা নক্ষত্রের নীরব প্রস্থান।
ক্যারিয়ার স্ট্যাটিসটিক্স দেখলে আসিফকে আহামরি ভাবার কিছু নেই। ৩৮ ওয়ানডেতে ৪৬ উইকেট, কিংবা ১১ টি-টোয়েন্টিতে ১৩ উইকেট তার লিথ্যাল বোলিংকে বর্ণনা করতে পারে না। তবে ২৩ টেস্টে প্রায় ২৪ গড়ে, ১০৫ উইকেট কিছুটা হলেও প্রশান্তি দেয়।
বিশ্বকাপ এবং ভাগ্য : ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে তার আরেক সতীর্থ শোয়েব আখতারসহ বাদ পড়ে যান আসিফ। পিসিবির বরাতে পাওয়া যায়, তারা সন্দেহ করছেন, আসিফ আনফিট। ‘১১ বিশ্বকাপটা খেলা হয়নি স্পট ফিক্সিংয়ে অভিযুক্ত হয়ে নিষিদ্ধ থাকায়। দুটো বিশ্বকাপেই পাকিস্তানের এক্স-ফ্যাক্টর হতে পারতেন তিনি।
দ্য ম্যাজিশিয়ান অফ দ্য বল
মডার্ন ক্রিকেটের অন্যতম পথিকৃৎ হাশিম আমলার মতে, ‘আমার ফেস করা সবচেয়ে কঠিন বোলার মোহাম্মদ আসিফ। আমি মনে করি, অনেকে এ ব্যাপারে আমার সাথে একমত হবেন যে, হি ওয়াজ দ্য ম্যাজিশিয়ান অফ দ্য বল।’ নিঃসন্দেহে আসিফ একজন ম্যাজিশিয়ান ছিলেন। এক দুর্ভাগা জাদুকর। সেদিনের লর্ডসের ঝকঝকে আকাশ তার জন্য গভীর অন্ধকার হয়ে এসেছিল, এনেছিল বিশ্ব ক্রিকেটের জন্যও। শৈল্পিক বোলিংয়ের মুন্সিয়ানা যিনি দেখিয়েছিলেন হ্যামেলিনের সেই বাঁশিওয়ালার মতো, সেই ক্রিকেট ইতিহাস তাকে আজ আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে। তিনি হয়ে উঠেছেন ক্রিকেটের ইডিপাস। 
ফরাসী ফুটবলের প্রথম রাজপুত্র মিশেল প্লাতিনি
একসময় তার তুলনা হতো দিয়াগো ম্যারাডোনার সাথে। ৮৬ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ম্যারাডোনার চেয়ে অনেকাংশে এগিয়েও ছিলেন। হয়তো ভাগ্যের আরেকটু সমর্থন পেলে ক্যারিয়ার শেষে যে অবস্থানে ছিলেন, তার চেয়েও এগিয়ে থাকতে পারতেন। অন্তত তার ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান বলে, তিনি ফুটবলপ্রেমীদের আরেকটু বেশি মনোযোগ দাবি করেন। তবে সেটা না পেলেও, গত শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়দের মাঝে প্রথম সারিতেই তিনি ছিলেন। যেকোনো দেশের জন্যই ‘প্রথম’ জিনিসটা একটু বিশেষ কিছু। প্রতিটি দেশেই যুগে যুগে অনেক গ্রেট জন্মায়। কিন্তু যে মানুষটি প্রথম কোনো কাজ করে, তাকে সবসময়ই একটা বাধার সম্মুখীন হতে হয়- সেটা হচ্ছে মানসিক বাধা। ইতিহাস ভাঙাটা খুব কঠিন কাজ, সবাই পারে না। যারা পারে, তারা ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় লিখে রাখে তাদের কীর্তি দ্বারা। ফ্রান্স ফুটবলের জন্য এমনই এক ইতিহাস গড়ার কাজ করেছিলেন মিশেল প্লাতিনি। 
মিশেল প্লাতিনি
মিশেল ফ্রঁসোয়া প্লাতিনি ১৯৫৫ সালে ২১ জুন ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। মিশেল ফ্রঁসোয়া প্লাতিনি হলেন একজন সাবেক ফরাসি ফুটবল খেলোয়াড়, ম্যানেজার এবং ২০০৭ সাল থেকে ইউনিয়ন অফ ইউরোপিয়ান ফুটবল এসোসিয়েশন (ইউইএফা) এর প্রেসিডেন্ট। তার খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি ফরাসি জাতীয় ফুটবল দল ছাড়াও ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার অনেক নামকরা ফুটবল ক্লাবে খেলেছেন।
ফ্রান্স বিশ্ব ফুটবলে বরাবরই একটা মাঝারি গোছের দল ছিল। ফুটবলে সর্বোচ্চ সফলতা পেতে হলে দল ভালো হওয়ার সাথে সাথে একজন স্পেশাল খেলোয়াড়েরও প্রয়োজন হয়। প্লাতিনি আসার আগে ফ্রান্স ফুটবলে তেমন কোনো তারকা ফুটবলার ছিল না। এক জা ফন্টেইন ছিলেন, যিনি এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড করেছিলেন (১৩ গোলের সেই রেকর্ডটাকে মোটামুটি অবিনশ্বর বলা যায়)। তবে তিনিও ক্লাব ফুটবল অথবা জাতীয় দলের হয়ে তেমন কিছু জিততে পারেননি।
ফ্রান্সকে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক (ইউরো ১৯৮৪) শিরোপা জেতানোর মূল নায়ক ছিলেন মিশেল প্লাতিনি। তবে সেটা এত অল্প কথায় বলে ফেললে প্লাতিনির মাহাত্ম্যটা ঠিকভাবে বোঝা যাবে না। এরকম ‘ওয়ান ম্যান শো’ আর কোনো টুর্নামেন্টে কেউ দেখাতে পেরেছেন কিনা সেটা বের করতে হলে, অবশ্যই আতশী কাচ নিয়ে বসতে হবে।
ইউরো কাপ শুরু : ইউরো কাপ শুরু হবার প্রথম আসরে ফ্রান্স ৪র্থ হয়েছিল। এরপর টানা ৫টি আসরে ফ্রান্স টুর্নামেন্টে কোয়ালিফাই করতে পারেনি। ১৯৮৪ ইউরোতে ফ্রান্স সুযোগ পায় স্বাগতিক হিসেবে।
আগের বছরের ব্যালন ডি অর জিতে ইউরো ১৯৮৪তে প্লাতিনি তারকা হিসেবেই শুরু করেছিলেন। তবে সব তারকা বড় টুর্নামেন্টে নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেন না। প্লাতিনি যেভাবে সুবিচার করলেন, তা ফুটবল ইতিহাসেই বিরল।
গ্রুপের প্রথম ম্যাচে ফ্রান্স ডেনমার্ককে হারায় প্লাতিনির দেওয়া একমাত্র গোলে। এরপরের ম্যাচে বেলজিয়ামকে ৫-০ গোলে হারানো ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন প্লাতিনি। তারপরের ম্যাচে যুগোস্লাভিয়াকে ৩-২ গোলে হারানো ম্যাচে আরেকটি হ্যাটট্রিক করেন তিনি। সেমিতে ফ্রান্স মুখোমুখি হয় পর্তুগালের। নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর ম্যাচটা অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। সেখানে এক পর্যায়ে ম্যাচের ফল হয় ২-২। ম্যাচটি টাইব্রেকার যাবে এমন ভাবনা যখন সবাই ভাবছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের ১১৯তম মিনিটে প্লাতিনির গোল। ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে দলের হয়ে ১ম গোলটিও প্লাতিনির পা থেকেই আসে। শেষ পর্যন্ত ৯০তম মিনিটে ফ্রান্স আরেকটি গোল করে ২-০ গোলে ম্যাচটা জিতে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে তাদের ১ম শিরোপা জয় করে। ইউরোর ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে প্লাতিনি টুর্নামেন্টের সবকটি ম্যাচে গোল করেন। যে টুর্নামেন্টে আর কোনো খেলোয়াড় ৩টির বেশি গোল করতে পারেননি, সেখানে স্ট্রাইকার না হয়েও ৯টি গোল করা নিঃসন্দেহে একটি বাড়তি কৃতিত্ব দাবি করে। এছাড়া ইউরো ইতিহাসে এক টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ডও প্লাতিনির। ক্লাব ফুটবলের প্লাতিনি অনেক আগে থেকেই সুপরিচিত ছিলেন। জুভেন্টাস তাদের ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতে ১৯৮৫ সালে। এর আগে দুবার ফাইনালে উঠলেও তাদেরকে রানার্স আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। প্রথমবারের মতো তাদের ইউরোপ সেরা হওয়ার পেছনে প্লাতিনির অবদান অসামান্য। একমাত্র সেমিফাইনাল বাদে প্রতিটা রাউন্ডে গোল করেন তিনি। ফাইনালে তার একমাত্র গোলেই জুভেন্টাস চ্যাম্পিয়ন হয়। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন তিনি।
জুভেন্টাস তাদের ইতিহাসের প্রথম ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপও জিতে প্লাতিনির নৈপুণ্যে। নির্ধারিত সময়ে ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটিতেও ১টি গোল করেন প্লাতিনি। পরে টাইব্রেকারে দলের পক্ষে সর্বশেষ গোলটি করে শিরোপা নিশ্চিত করেন তিনি। ম্যান অব দি ম্যাচ হন প্লাতিনি। প্লাতিনিই প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা তিন বার ব্যালন ডি অর জেতার রেকর্ড করেন। বড় ম্যাচে জ্বলে ওঠার জন্য বিখ্যাত প্লাতিনি বিশ্বকাপেও যথেষ্ট ভালো খেলেছেন। তিনি দলে আসার আগের দুই বিশ্বকাপে ফ্রান্স বাছাই পর্বের গ-িই পার করতে পারেনি। ১৯৭৮ বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে বুলগেরিয়াকে ৩-১ গোলে হারানো ম্যাচে প্লেমেকার হিসেবে খেলা প্লাতিনি ৩০ গজ দূর থেকে একটা গোল করে সবার নজরে পড়েন। তবে মূল বিশ্বকাপে তেমন কিছু করতে পারেননি। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মাত্র ১টি গোল করতে সক্ষম হন, দলও বাদ পড়ে যায় গ্রুপ পর্ব থেকে।
পরের বিশ্বকাপের (১৯৮২) বাছাই পর্বে নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ফ্রি কিক থেকে গোল করে প্লাতিনি দলকে মূল পর্বে উঠতে সাহায্য করেন। এই বিশ্বকাপে প্লাতিনি অধিনায়কের দায়িত্ব পান। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব পার করে সেমি ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির মুখোমুখি হয় ফ্রান্স। এই ম্যাচটিকে ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে গণ্য করা হয়। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচটি ৩-৩ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে পশ্চিম জার্মানি ম্যাচটা জিতে নেয়। ম্যাচে ফ্রান্সের পক্ষে প্রথম গোলটি করেন প্লাতিনি। ম্যাচটিকে প্লাতিনি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় স্মৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
পরের বিশ্বকাপে ফ্রান্স গ্রুপ পর্ব পার হয়ে দ্বিতীয় পর্বে মুখোমুখি হয় আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ইতালির। ইতালিকে ২-০ গোলে হারানো ম্যাচের প্রথম গোলটি করেন প্লাতিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে তারা মুখোমুখি হয় দুর্র্ধর্ষ ব্রাজিলের। ব্রাজিলের সেই দলে খেলেছিলেন জিকো আর সক্রেটিসের মতো কিংবদন্তী খেলোয়াড়। ক্যারেকার গোলে ব্রাজিল এগিয়ে গেলেও, প্লাতিনির গোলেই ফ্রান্স ম্যাচে ফেরত আসে। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ম্যাচটা জিতে নেয় ফ্রান্স। সেমিতে আবারও মুখোমুখি হয় পশ্চিম জার্মানির এবং এবারও হেরে যায় ফ্রান্স। প্লাতিনি অবসরে যাবার পরের দুই আসরে ফ্রান্স বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের গ-িই পার হতে পারেনি।
কোনো বিশ্বকাপেই প্লাতিনি গোল্ডেন বল, সিলভার বল কিংবা ব্রোঞ্জ বল পাননি। তবে এর পরেও ২০১৪ সালে গার্ডিয়ান পত্রিকার মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়ের তালিকায় দশম স্থানে আছেন তিনি। অথচ অনেক বিশ্বকাপ জয়ী এবং গোল্ডেন বল জয়ী খেলোয়াড়ও তালিকায় তার পেছনে রয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায়, বিশ্বকাপে তার পারফর্মেন্স কতটা চমকপ্রদ ছিল। ফ্রান্সের হয়ে খেলা ৭২টি ম্যাচের মাঝে ৪৯টিতেই অধিনায়ক হিসেবে ছিলেন প্লাতিনি, দলের হয়ে ৪১টি গোল করেন তিনি, যা কিনা এক সময় ফ্রান্সের পক্ষে সর্বোচ্চ ছিল। পরবর্তীতে থিয়েরি হেনরি রেকর্ডটা ভেঙে ফেলেন। তবে হেনরির গোল গড় প্লাতিনির (০.৫৭) চেয়ে অনেক কম (০.৪১)। প্লাতিনিকে ভালোভাবে বুঝতে চাইলে এসব পরিসংখ্যানও যথেষ্ট নয়। ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাস পরবর্তীতে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য যার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, সেই জিনেদিন জিদানের একটা উক্তি থেকে প্লাতিনি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে-
“যখন আমি ছোট বেলায় বন্ধুদের সাথে খেলতাম তখন সবসময়ই প্লাতিনির মতো হতে চাইতাম।”
জিদান এক সময় অর্জনে হয়তো প্লাতিনিকে ছাড়িয়েও গিয়েছেন, তবে ‘চেষ্টা করলে কিছু করা যাবে’ এমন বিশ্বাসের ভিত্তিপ্রস্তরটা কিন্তু প্লাতিনির গড়ে দেওয়া। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ প্রকাশিত)
 



..........