মঙ্গলবার, ১৮-ডিসেম্বর ২০১৮, ০৪:২২ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরে এমপিওভুক্তি জালিয়াতি: শ’ শ’ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ধামাচাপা

কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরে এমপিওভুক্তি জালিয়াতি: শ’ শ’ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ধামাচাপা

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৪:২৯ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে এমপিওভুক্তির একটি ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে অযোগ্যদের এমপিওভুক্তিতে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্মকর্তাদের শ’ শ’ কোটি টাকার দুর্নীতি বেরিয়ে এসেছে। এক শিক্ষকের এমপিওভুক্তিতে জালিয়াতি উদঘাটন করতে গিয়ে ৬১ জন অযোগ্য শিক্ষককে ২০১০ সালের জুলাই মাসে জালিয়াতির মাধ্যমে এমপিওভুক্ত করার তথ্য প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। এ যেন কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে এমপিওভুক্ত ১৬৩০ টি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১৮ হাজার ৬শ’ ৫২ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অবৈধভাবে নিয়োগ ও এমপিওভুক্ত করা হয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে তদন্ত কমিটি। তাই এমপিওভুক্তিতে ব্যাপকহারে এসব দুর্নীতি-জালিয়াতির ঘটনা বিস্তারিতভাবে তদন্তের সুপারিশও করেছেন তারা। তবে অযোগ্য শিক্ষকদের এমপিওভুক্তিতে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্মকর্তাদের শ’ শ’ কোটি টাকার দুর্নীতির এই ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে শিক্ষাখাতের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। হাইকোর্টের নির্দেশে উচ্চতর একটি তদন্ত কমিটি এই ঘটনা তদন্তের পর প্রতিবেদন দিলে সিন্ডিকেটের মাথা খারাপ হয়ে যায়। তাদের আশঙ্কা এই দুর্নীতি জালিয়াতির বিশদ তদন্ত হলে এমপিও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত রাঘব বোয়ালদের নামও বেরিয়ে আসবে। হাতেনাতে ধরা পড়বেন এখনকার কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মহা দুর্নীতিবাজ মো. মোস্তাফিজুর রহমান। কারণ, তিনি ওই সময় ছিলেন কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক পদে এবং এ কাজটি তার দফতর থেকে ও তার কমপিউটার থেকেই হয়েছে। এমনকি খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও এতে ছাড় পাবেন না। এর কারণ একের পর এক দুর্নীতি-জালিয়াতিতে ধরা পড়ার পরও শিক্ষামন্ত্রী এই মোস্তাফিজুর রহমানকে দফায় দফায় প্রশ্রয় এবং পুরস্কৃত করেছেন। আর এজন্যই ওই প্রতিবেদনে দেয়া তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। নতুন করে অকার্যকর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দীর্ঘ ৮ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এই কমিটি রিপোর্ট দাখিল করেনি। নিয়ম অনুযায়ী পুনঃতদন্তের জন্য আরো উচ্চ পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের দিয়ে কমিটি গঠন করতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে রহস্যজনকভাবে অপেক্ষাকৃত নিচের পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একজন যুগ্মসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বে আগের তদন্ত হলেও পুনঃতদন্তের নামে কমিটি হয়েছে একজন উপসচিবের নেতৃত্বে। ৩ সদস্যের এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের উপসচিব মোঃ আব্দুর রহিমকে। চলতি বছরের ৩ এপ্রিল এই কমিটি করার পর ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ওই কমিটি তদন্ত শেষ না করে গড়িমসি করছে। মূলত পুনঃতদন্তের নামে গোটা দুর্নীতি-জালিয়াতির ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। আর এর সবই খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ইশারায় হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের একদল অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশে অবৈধ অর্থলেনদেনের মাধ্যমে জালিয়াতি করে এমপিওভুক্ত হন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বাজারপাড়া কারিগরি স্কুল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ মো. খায়রুল ইসলাম। শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতি করে নিয়োগপত্র সংগ্রহ করে এমপিওভুক্তির আবেদন করেন অধ্যক্ষ খায়রুল। এ আবেদন নাকচ করা হলেও আইসিটি সেলের মাধ্যমে এমপিও প্রদানের বিষয়ে ডাটা এন্ট্রি করে জুলাই ২০১০-এ এমপিওভুক্ত হন অধ্যক্ষ খায়রুল। ২০১০ সালে পাওয়া অবৈধ এই নিয়োগ ও এমপিওভুক্তি বাতিল চেয়ে প্রতিষ্ঠানের জমিদাতা রফিকুল ইসলাম ২০১৭ সালে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। ওই রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট খায়রুল ইসলামের এমপিও স্থগিত করে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জালিয়াতি তদন্তের নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পিআইডব্লিউ ও পিআইইউ) যুগ্মসচিব মোঃ অহিদুল ইসলাম ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (শাখা-২) নাজমুন নাহারকে এই জালিয়াতি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। তদন্ত কমিটি একই বছরের ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাজারপাড়া কারিগরি স্কুল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ খায়রুল ইসলামের এমপিওভুক্তিতে জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে আরো ৬১ জনের এমপিওতে জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। ওই ৬১ জনকেই ২০১০ সালের জুলাই মাসে এমপিওভুক্ত করা হয়েছিলো অবৈধভাবে। তদন্ত কমিটি বলছে, অনুসন্ধানে দেখা যায় ওই ৬১ জনের কারোরই প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা ছিলো না। অথচ ৮২ জনের একটি তালিকা থেকে ওই ৬১ জনের তথ্যাদি এমপিওভুক্তির জন্য ডাটা এন্ট্রি করা হয়েছে। 
এই তদন্ত করতে গিয়ে অধিদপ্তরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাখায় কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারী ও আইটি বিশেষজ্ঞদের লিখিত বক্তব্য ও প্রশ্নোত্তর গ্রহণ করে কমিটি। এছাড়া অধিদপ্তরের এমপিও শাখা থেকে পাওয়া বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা করেন। অভিযোগকারী, অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট ১৮ জন কর্মকর্তা কর্মচারীর লিখিত বক্তব্য ও প্রশ্নোত্তর গ্রহণ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে ব্যবহৃত এমপিও সফটওয়্যার এক্সপার্ট রাজিব আরেফিনের লিখিত বক্তব্য ও স্বাক্ষরিত রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১০ সালের জুলাই মাসের এমপিও শিটে খায়রুল ইসলামসহ ৬১ জনের এমপিওভুক্তির ডাটা  তৎকালীন পরিচালক (ভোকেশনাল) ও বর্তমানে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানের ইউজার আইডি সড়ংঃধভরু ও পাসওয়ার্ড এর মাধ্যমে ২০১০ সালের ২১ আগস্ট  বিকেল ৩ টা ২৩ মিনিট থেকে ৪ টা ৪ মিনিট পর্যন্ত এমপিও সফটওয়্যারে ডাটা এন্ট্রি দেয়া হয়েছে। অতি অল্প সময় অর্থাৎ ৪১ মিনিটের মধ্যে ৬১ জনের ডাটা এন্ট্রি করা হয়েছে যা কম্পিউটারে অতিদক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি ছাড়া করা সম্ভব নয়। 
তদন্ত কমিটি বলছে, তৎকালীন পরিচালক (ভোকেশনাল) মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ওই সময় এমপিওর বিষয়টি তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন। এমপিওভুক্তদের ডাটা এন্ট্রি করার জন্য আইসিটি সেলের যে কম্পিউটারটি ব্যবহার করা হতো সেটির অ্যাডমিন পাসওয়ার্ড শুধুমাত্র তার কাছেই ছিলো। ডাটা এন্ট্রির মূল তত্ত্বাবধায়কও ছিলেন তিনি।
তদন্ত কমিটি ওইসময় দায়িত্বপালনকারী সংশ্লিষ্ট যেসব কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়েছে তারা প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, এমপিওভুক্তির জন্য যেসব আবেদন আসতো অধীনস্থ কর্মকর্তারা তা যাচাই-বাছাই করে পরিচালক (ভোকেশনাল) মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে জমা দিতেন। তিনি তা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক প্রফেঃ ড. নিতাই চন্দ্র সূত্রধরের কাছে পেশ করতেন। মহাপরিচালক এমপিওভুক্তির বিষয়ে নথিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে পরিচালকের কাছে পাঠাতেন। 
তৎকালীন পরিচালক (ভোকেশনাল) মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান তার তত্ত্বাবধানে এমপিওভুক্তির অনুমোদনকৃত নথি ডাটা এন্ট্রির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেন। তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এমপিওর স্যালারি শিটে ডাটা এন্ট্রির জন্য পরিচালক (ভোকেশনাল) মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ও সংযুক্ত কর্মকর্তা মোঃ মোস্তফার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ছিলো। তাদের ব্যক্তিগত ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেই এমপিও সংক্রান্ত ডাটা এন্ট্রি করা হতো। তবে ডাটা এন্ট্রির জন্য আইসিটি সেলের কম্পিউটারটির পাসওয়ার্ডটি ছিলো শুধুমাত্র পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে। সুতরাং তার অনুমতি ছাড়া এমপিও সংক্রান্ত কোনো ডাটা এন্ট্রি যে একেবারেই অসম্ভব ছিলো তদন্তে তা স্পষ্ট হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে যে একইসঙ্গে একাধিক ব্যক্তির ফাইল পর্যালোচনা করা হয়নি। কিংবা কোনো তালিকা তৈরি করে এমপিওভুক্ত করা হয়নি। সুতরাং ২০১০ সালের ২১ আগস্ট মাত্র ৪১ মিনিটে যে ৬১ জনের এমপিওভুক্তির ডাটা এন্ট্রি করা হয়েছে যা গোটাটাই পূর্ব পরিকল্পিত। তদন্ত কমিটি এমপিও শাখা থেকে ওই সময়ের ৮২ জনের একটি তালিকা উদ্ধার করেছে। যাদের কারোরই প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছিলো না। কিন্তু এরমধ্যে ৬১ জনেরই এমপিওভুক্তির ডাটা এন্ট্রি হয়েছে। দুর্নীতি, জালিয়াতি ও ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে যে এই ৬১ জনের এমপিওভুক্তি হয়েছে তৎকালীন কর্মকর্তা বর্তমানে ইউডিএ কাম কম্পিউটার অপারেটর  হোসনাবাদ টিএসসি, দৌলতপুর, কুষ্টিয়ায় কর্মরত যুবাইদ কাইসার বিন রহিমের লিখিত বক্তব্যেও তার আভাস মিলেছে। তিনি বলেছেন, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের যেসব অধ্যক্ষের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিচালক (ভোকেশনাল) এর তথ্য চাওয়ার প্রেক্ষিতে তাদের একটি কম্পিউটার শিট বা তালিকা ওই সময় করা হয়েছিলো। তবে সেটি এমপিওভুক্তির উদ্দেশ্যে করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। যুবাইদ কাইসার বিন রহিমের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, অযোগ্য শিক্ষকদের তালিকা করে বিশাল অংকের ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিচালক তাদেরকে এমপিওভুক্ত করেছিলেন। আর এ জন্যই ওই তালিকা করা হয়েছিলো।
তৎকালীন মহাপরিচালক নিতাই চন্দ্র তদন্ত কমিটির কাছে তার বক্তব্যে বলেছেন, এমপিওভুক্তির প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য সংযুক্তি শাখা হতে নথি উপস্থাপনের পর পরিচালক  (ভোকেশনাল) এর মাধ্যমে মহাপরিচালকের কাছে উপস্থাপিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে মিটিংয়ে যাচাই-বাছাই করে  যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের এমপিওভুক্তির প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়া হতো। এ সংক্রান্ত নথি যাচাই করে দেখা যায়, খায়রুল ইসলামের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকায় এমপিওভুক্ত করার সুযোগ নেই মর্মে মতামত দেয়া হয়েছে। অথচ মাত্র ৪১ মিনিটে সেই খায়রুলসহ ৬১ জনের এমপিও ডাটা এন্ট্রি করা হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের এমপিও সফটওয়্যার ডেভলপার রাজিব আরেফিন জানিয়েছেন, পরিচালক (ভোকেশনাল) মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান এর আইডি দিয়েই খায়রুলের ডাটা এন্ট্রি করা হয়েছে। তার অনুমোদন ছাড়া কিছুতেই এটি সম্ভব ছিলো না। 
সূত্র বলছে, মূলত অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক, এমপিওর দায়িত্বে থাকা পরিচালক (ভোকেশনাল)সহ প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশেই জালিয়াতির মাধ্যমে এই এমপিও ডাটা এন্ট্রি হয়েছে। বিধি অনুযায়ী তারা ওই শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করতে না পেরে ডিজিটাল জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। আর জালিয়াতির এতবড় ঘটনা কোনোভাবেই শিক্ষামন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া যে হয়নি তাও স্পষ্ট। কারণ, যেসব শিক্ষক এমপিও কমিটির মিটিংয়েই বাদ পড়েছেন, পরবর্তীতে কীভাবে সকলের অগোচরে এতো বছর ধরে তারা বেতন-ভাতা তুলেছেন তা রহস্যজনক। উচ্চপদস্থদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া কোনোভাবেই এই জালিয়াতি হয়নি। এর বড় প্রমাণ পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানের আইডি থেকে তার তত্ত্বাবধানে ৬১ জনের এমপিওভুক্তির ডাটা এন্ট্রি। তদন্তকালে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এমপিও এর স্যালারি শিট প্রিন্ট করার পর তা পরিচালক এমপিও সই করতেন। সুতরাং কোনোভাবেই তার অজ্ঞাতে এই দুর্নীতি হয়নি। এ বিষয়ে চিঠি দেয়া হলেও তিনি তদন্ত কর্মকর্তাদের ডাকে সাড়া দেননি। এমনকি কোনো প্রকার যোগাযোগও করেননি।
এমন পরিস্থিতিতে এমপিওভুক্ত ১৬৩০ টি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১৮ হাজার ৬শ’ ৫২ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অবৈধভাবে নিয়োগ ও এমপিওভুক্ত করা হয়েছে বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। এই অবৈধভাবে নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির কারণে প্রতিমাসে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে ব্যয় হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। একইসঙ্গে এই ঘটনা  অতীব জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করে বিধিগত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
কিন্তু, যুগ্মসচিব অহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত এই তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দাখিল করে ৭ ডিসেম্বর ২০১৭। এর চারমাস পরে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সুবোধ চন্দ্র ঢালীর স্বাক্ষরে উপসচিব আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি দীর্ঘ আট মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এ পর্যন্ত রিপোর্ট দাখিল করেনি। নিয়মানুযায়ী যুগ্মসচিবের তদন্তের পর অধিকতর তদন্তের জন্য এক্ষেত্রে ন্যূনপক্ষে অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি হওয়ার কথা। অথচ তা না করে উপসচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি হয়েছে। এটা দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়া ছাড়া কিছুই নয়।
( সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৬ নভেম্বর ২০১৮ প্রকাশিত)