মঙ্গলবার, ১৮-ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫:৩৭ অপরাহ্ন

গুমের স্বর্গরাজ্যে মানবাধিকার চর্চা!

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০৭:২৪ অপরাহ্ন

ডঃ মুহাম্মদ রেজাউল করিম: আধুনিক রাষ্ট্রের উৎপত্তির পূর্বে অধিকারের জন্ম হয়েছে নাকি রাষ্ট্রই অধিকার সৃষ্টি করেছে তা নিয়ে পণ্ডিত মহলে বিতর্ক আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, Legal Right বা আইনগত আধিকার হলো সেই স্বার্থ যা আইনের নীতিসমূহ দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত। যেমন কথা বলার আধিকার, চলা-ফেরার অধিকার, যার মধ্যে মানুষের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 
মূলত মানুষের মৌলিক আধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে পৃথিবীতে হিটলার ও মুসোলিনীর অক্ষশক্তির নৃসংশতা ও বর্বর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। যাতে স্তম্ভিত হয়েছে বিশ্ববিবেক। বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা এখন হিটলার ও মুসোলিনীর অক্ষশক্তির নৃসংশতা ও বর্বর কর্মকা-কেও হার মানাতে বসেছে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, হত্যা, গুম, জুলুম, লুণ্ঠন, রাহাজানি, অক্টোপাশের মত জাতিকে ঘিরে ফেলেছে। রাষ্ট্র যখন মানুষের অধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তখন নাগরিকগণ সবচেয়ে বেশী অসহায়ত্বের মধ্যে নিমজ্জিত হয়।
একজন মানুষ অসুস্থ হলে সুস্থ হওয়ার আশায় আপনজন বুকবাধে। কেউ মৃত্যুবরণ করলে মানুষ তার জন্য দোয়া করতে থাকে, মনকে চূড়ান্ত প্রবোধ বা সান্ত¡না দেয়া যায়। মৃত ব্যাক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। কবর জিয়ারত করে মনকে অন্তত সান্ত¡নাটুকু দেয়া যায়। কিন্তু গুম যেন সব বেদনা থেকে ব্যতিক্রম! গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার যেন কোনই শেষ নেই! নেই কোন সমাধান!! আপনজনকে ফিরে পাবার আশায় প্রহর গুণতে থাকে অনন্ত সময়। যেন রাত পোহায়না!!
আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ এখন একটি গুমের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে পৃথিবীব্যাপী।
প্রতি বছর বিশ^ব্যাপী আন্তর্জাতিক গুম দিবস পালন করা হয়। এবারও হয়েছে। ভিকটিমদের প্রতি কিছুটা সাময়িক সহানুভূতি প্রদর্শন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। কিন্তু নির্যাতনকারীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মানবাধিকার চর্চার অভাবে গুমের মত অমানবিক একটি নির্যাতন পদ্ধতির জন্ম হয়েছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই চালু হয় গুম প্রথার। এর অধিকাংশই রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে হয়েছে। 
পৃথিবীতে নিপীড়ক শ্রেণি সাধারণত নানাভাবে মানুষকে নির্যাতন করে আসছে অনাদিকাল থেকে। একসময় কার্য হাসিলের জন্য শারিরীক নির্যাতন, জরিমানা, বন্দি কিংবা হত্যা করা হতো। কিন্তু আধুনিক সভ্যতায় আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে সেটি হল-গুম। 
বিনাবিচারে মানুষকে গুম করে ফেলা হচ্ছে। অপরাধী কিংবা নিরপরাধী প্রমাণ করার থাকছে না কোন প্রকার সুযোগ। মাসের পর মাস বছরের পর বছর থাকতে হচ্ছে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। ভিকটিমের পরিবারের থাকছে না কোনপ্রকার বিচার চাইবার নূন্যতম পরিবেশ। 
আপনজন বয়ে বেড়াচ্ছে এক অমানবিক, দুঃখ, কষ্ট, বেদনা। সন্তানহারা বাবা-মায়ের রাতজাগা ক্রন্দন, স্বামীহারা স্ত্রীর অব্যক্ত বেদনা, বাবাহারা সন্তানের অশ্রুসিক্ত চাহনী আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করলেও এই অমানবিক কাজের হুকুমদাতা কিংবা সংশ্লিষ্টদের পাষাণ হৃদয়ে এতটুকু করুণা জাগ্রত হচ্ছে না। 
২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আইনে মানুষের অধিকার রক্ষা ও উন্নয়নের কথা বলা থাকলেও বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রবণতা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি  মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বিচারবহির্ভূত হত্যাও গুমের মাধ্যমে। 
এসব ক্ষেত্রে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অধিকহারে জড়িত বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কখনো বা সাদা পোষাকে, কখনো বা ইউনিফর্ম পরিহিত বাহিনী এসব হত্যা বা গুমের সাথে জড়িত হয়েছে হয়েছে। উদ্বেগের দিক হলো ভিকটিমের পরিবার নিখোঁজ স্বজনের বিষয়ে থানায় গিয়ে জিডি করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরডব্লিউ মানবাধিকার রক্ষায় বাংলাদেশকে ব্যর্থ বলে আখ্যা দিয়েছে। সংস্থাটি ৯০ টিরও বেশি দেশের মানবাধিকার পরিস্থতি পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন রিপোর্ট দেয়।
বাংলাদেশে বিরোধী মতের রাজনৈতিক কর্মী কিংবা শত্রুতামূলকভাবে গুম করার মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের হিসাবে বর্তমান সরকারের আমলে অর্থাৎ ২০০৯ থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত গুমের শিকার হয়েছেন প্রায় ৪৩২ জন  নাগরিক। সংস্থাটির হিসেব অনুযায়ী নিখোঁজ হওয়াদের মধ্যে ফিরে এসেছে মাত্র ২৫০ জন। কিন্তু এখনো নিখোঁজদের ব্যাপারে কোন প্রকার তথ্য-উপাত্ত সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনসম্মুখে প্রকাশ করেনি। তবে গুম হওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী তথা বিএনপি-জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মী। যাদের অনেকে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ২০১০ সালে গুম হন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম, ২০১২ সালে গুম হন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী, এখনো নিখোঁজ আছেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর, অধ্যাপক গোলাম আযম এর পুত্র বিগ্রেডিয়ার (অবঃ) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী, মীর কাসেম আলীর পুত্র ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাশিম, শিবির নেতা হাফেজ জাকির হোসাইন, ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা আল মোকদ্দাস ও ওলি উল্লাহসহ জামায়াত-শিবিরের শীর্ষ পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মী। নিখোঁজ হওয়া বিএনপি নেতা সালাউদ্দিনকে ভারতের শিলিগুড়িতে পাওয়া যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরবর্তীতে তাকে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী সাজিয়ে পুলিশ আটক করে ভারতের কারাগারে বন্দি করে ।
নতুন উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে গুমের তালিকায় এখন আর রাজনৈতিক কর্মী সীমাবদ্ধ নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, সাবেক রাষ্ট্রদূত এমনকি সরকারদলীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই তালিকায় এসেছে। 
বাংলাদেশে গুম পরিস্থিতির যে চরম অবনতি হয়েছে তা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ৩৯তম নিয়মিত অধিবেশন উপলক্ষে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কাছে পাঠানো এক রিপোর্টে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন এশিয়ান লিগ্যাল রিসোর্স সেন্টার (এএলআরসি) ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪৩২ জন  নাগরিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক গুমের শিকার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 
এএলআরসি আরো বলেছে, নাগরিকদের তুলে নেয়া ও গুমের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ কোনভাবেই স্বীকার করছে না আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। যদিও গুম হওয়ার কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর অনেক নাগরিককে বন্দি অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো গুমের সাথে সংশ্লিষ্টতা স্বীকার না করলেও অনেক ক্ষেত্রে যে জড়িত তার প্রমাণ মিলেছে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার রায়ের মাধ্যমে। নারায়ণগঞ্জের ওই মামলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়ার জামাতা র‌্যাবের কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মৃত্যুদ-প্রাপ্ত হন। এমতাবস্থায় গুমের সাথে প্রশাসনের লোক ও সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের যোগসাজশ থাকাটাও অস্বাভাবিক মনে হয় না। কেননা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে এক বক্তব্যে বলেছেন, গুমের ঘটনা এখনই প্রথম নয় সারা বিশে^ হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উদাহরণ টানেন। কিন্তু তাঁর এমন বক্তব্যে গুমের শিকার লোকদের ফিরে পাওয়া ও ভিকটিমের পরিবারের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বাধাগ্রস্ত করবে বলে অনেকের ধারনা। যেহেতু গুম কোনভাবেই মানবাধিকার রক্ষা করে না সেহেতু এরূপ মন্তব্য কোনভাবেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হতে পারে না। 
গত ৩০ আগষ্ট প্রথম আলো পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে গুম হওয়া ৫ জন ব্যাক্তির পরিচয় গোপন করে তাদের অভিজ্ঞতার কথা ছেপেছে। এতে রোমহর্ষক সব ঘটনা তারা বর্ণনা করেছেন। গুম থাকাকালীন ব্যক্তিরা এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না । কেননা তাদের প্রত্যেককে মাসের পর মাস হাত পা ও চোখ বেধে অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়েছিল। তাদের অনেকের চোখের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সবসময় তাদেরকে এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করছে। 
বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০১৭ অনুযায়ী কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য বা অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবার কথা থাকলেও এখন তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছেন।
বাংলাদেশে যেসকল গুমের ঘটনা ঘটছে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধের কারণে। তবে তা গণতন্ত্রের বিকাশ ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কোনভাবেই মঙ্গলজনক নয়। দৃশ্যপট এমনি মনে হচ্ছে বাংলাদেশ এখন গুমের একটি স্বর্গরাজ্যে। যে দেশে গুমের সাথে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা সরাসরি জড়িত সেখানে জনগণকে জননিরাপত্তা কে দিবে? কিন্তু রাষ্ট্র-ই যদি অধিকার ভোগে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ রক্ষক যদি ভক্ষকের আসনে আসীন হয়। তখন-ই খর্ব হয় মানুষের মৌলিক অধিকার, ঘটে আইনের বিপত্তি ও মহাবির্যয়।
এ জন্যই মনীষী Gettel বলেছেন- In a state of nature real liberty for all would be impossible....  অর্থাৎ রাষ্ট্র অধিকার ভোগের নিশ্চয়তা না দিলে সে অধিকার অর্থহীন।